গ্রিনকার্ড বা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় কঠোরতা আরোপের ঘোষণা দিয়েও শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান থেকে আংশিক সরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)। সম্প্রতি জারি করা একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, বিশেষ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া স্থায়ী রেসিডেন্সির জন্য আবেদনকারী অভিবাসীদের গ্রিনকার্ড অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে হবে।
তবে নির্দেশনাটি প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক শুরু হলে প্রশাসন নতুন করে ব্যাখ্যা দেয়। তারা জানায়, এটি কোনো সর্বজনীন বা বাধ্যতামূলক নিয়ম নয় এবং সব অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে হবে—এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। গ্রিনকার্ড আবেদনকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)-এর কর্মকর্তাদের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে।
ডিএইচএস-এর এক মুখপাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি ক্ষমতা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের আগে থেকেই ছিল। নতুন নির্দেশনায় কেবল সেই ক্ষমতার বিষয়টি আবারও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন অথবা যেসব দেশের নাগরিকরা তুলনামূলকভাবে বেশি সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম বেশি প্রযোজ্য হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা প্রশাসনের এই অবস্থান পরিবর্তনকে ‘আংশিক ইউ-টার্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তবে নতুন ব্যাখ্যা দেওয়ার পরও অভিবাসী ও তাদের আইনজীবীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি। কোন পরিস্থিতিতে এই নিয়ম কার্যকর হবে এবং কারা এর বাইরে থাকবেন, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়নি।
এমনকি নীতিটি প্রথমবার জনসমক্ষে আসার সময় খোদ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ভেতরেও এর বাস্তব প্রয়োগ ও পরিধি নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল বলে জানা গেছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টিকে বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং প্রশাসনিক পর্যায়ের একটি অভ্যন্তরীণ সমন্বয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি গ্রিনকার্ড সাক্ষাৎকারে আবেদনকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে কেন তারা নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন করছেন না এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার পেছনে কোনো বিশেষ কারণ রয়েছে কি না।
থার্ড ওয়ে নামের একটি সামাজিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং ইউএসসিআইএস-এর সাবেক কর্মকর্তা সারাহ পিয়ার্স বলেন, জনসাধারণের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে প্রশাসন এখন নিজেদের তৈরি করা জটিলতা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে মার্কিন চেম্বার অব কমার্সসহ বিভিন্ন বড় ব্যবসায়ী সংগঠনও এ নীতির সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারত।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৪ লাখ গ্রিনকার্ড প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার আবেদন অনুমোদিত হয়েছে ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যা আবেদনকারীদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই গ্রিনকার্ড পাওয়ার সুযোগ দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত কঠোর নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারত পারিবারিক স্পনসরশিপের আওতায় থাকা অভিবাসীদের ওপর এবং সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি খাতে কর্মরত এইচ-১বি ভিসাধারী দক্ষ বিদেশি কর্মীদের ওপর।
তাদের মতে, শেষ মুহূর্তে প্রশাসনের এই আংশিক অবস্থান পরিবর্তন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি কর্মকর্তাদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়ার ফলে অভিবাসী সমাজে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে আইনি অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
/এসএন