• ঢাকা
  • সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৬ এএম


হামে কেন এত শিশুমৃত্যু

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৫ মে ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। এ নিয়ে চলতি বছরে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা যেত কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে কি না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নিশ্চিত হামে ২ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫ জনের মধ্যে ২ জন আগের দিন মারা যান। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২৫৯ জনের এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৫২ জনের। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৩১১ জনে।

গত ১২ এপ্রিল এক বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা মত দেন, হামের প্রাদুর্ভাব চলাকালে উপসর্গ থাকা রোগীর মৃত্যুকেও হামের মৃত্যু হিসেবে গণ্য করতে হবে। সেই হিসাবে ৩১১ জনের মৃত্যুই হামের সঙ্গে সম্পর্কিত।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজার জেলার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে প্রথম হামের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। শুরুতে বিষয়টি তেমন আলোচনায় না এলেও ধীরে ধীরে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে প্রথমে রাজশাহী এবং পরে দেশের আরও কয়েকটি জেলায় হামের বিস্তার দেখা যায়। ২৪ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায়, অর্থাৎ ৯১ শতাংশ এলাকায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকার ৫ এপ্রিল ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে টিকাদান কার্যক্রম চালু রয়েছে, যা ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য চলবে এ মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত।

তবে প্রতিদিনই হামে বা এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ৩ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮ মাস বয়সী হাসান নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। তার বাড়ি লালমনিরহাটের সাপ্টিবাড়ী এলাকায়। উন্নত চিকিৎসার অভাবে তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল। এর আগের দিন ২ মে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নে তাংতুই ম্রো নামে ৮ বছর বয়সী আরেক শিশুর মৃত্যু হয়, যিনি লামা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং মৃত্যুর দুই দিন আগে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন।

শিশুমৃত্যু বাড়তে থাকায় সরকার আইসিইউ সুবিধা বাড়ানোর কথা বলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করে হাসপাতালে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিস্তারিত তথ্য—যেমন বয়সভিত্তিক তথ্য, হাসপাতালে আসার সময়, জটিলতা, চিকিৎসা পদ্ধতি—এসব প্রকাশ করা হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্য জানা গেলে মৃত্যুহার কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হতো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানান, এসব তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার। তবে সিডিসির পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বলেন, তাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো কাজ করা হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। এতে নিউমোনিয়া হলে তা জটিল আকার ধারণ করে এবং অন্যান্য জটিলতাও দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে দেরিতে হাসপাতালে আনা হয়, তখন তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক বলেন, “হামের চিকিৎসায় কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে তা জটিল হয়। হাম হলে আরও অনেক জটিলতা দেখা দেয়। হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে অনেক জটিলতা হওয়ার পর। লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না।”

হাসপাতালটির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশের ৪২টি জেলার ৫১০ জন শিশু সেখানে চিকিৎসা নিয়েছে, যাদের মধ্যে ২২ জন মারা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসনিম জানান, অনেক শিশুকে দেরিতে হাসপাতালে আনা হচ্ছে এবং তারা গুরুতর অবস্থায় থাকে। হামের কারণে নিউমোনিয়ায় ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসা দিয়েও তাদের সুস্থ করা সম্ভব হচ্ছে না।

চলতি বছরে ৪১ হাজার ৭৯৩ জন রোগী হামের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছে, যাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ২৮ হাজার ৮৪২ জন। তবে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ জন। কিটের অভাব এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসার কারণে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হামজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অক্সিজেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও সবগুলো শিশুদের জন্য উপযোগী নয়। ভেন্টিলেটরের পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ানো গেলে আরও বেশি শিশু উপকৃত হতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, কোভিড-১৯ সময়ের মতো উচ্চমাত্রার অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা গেলে কিছু শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি—যেমন শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, বুক দেবে যাওয়া, খাবার গ্রহণে অক্ষমতা, বারবার বমি, খিঁচুনি, অচেতনতা, চোখ বা মুখে সমস্যা এবং তীব্র অপুষ্টি বা পানিশূন্যতা।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই। অপ্রয়োজনীয় ভিড়ের কারণে প্রকৃত গুরুতর রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের পৃথক রাখা গেলে হাসপাতালে চাপ কমবে এবং মৃত্যুহারও কমানো সম্ভব হবে।