• ঢাকা
  • রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৫ এএম


ঢাকের তালে জমজমাট কিশোরগঞ্জের ৫০০ বছরের হাট, একেকটি ঢাকি দলের চুক্তি লাখ টাকারও বেশি

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ৮:৩৮ এএম

শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জমে উঠেছে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে হাটের পুরো এলাকা। ঢাক-ঢোল, কাঁসি-সানাই, করতাল ও বাঁশির সম্মিলিত সুরে সেখানে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নিজেদের দক্ষতা ও পরিবেশনা তুলে ধরছেন শিল্পীরা। তাদের বাজনা শুনে পছন্দের বাদকদল নির্বাচন করছেন দুর্গাপূজার আয়োজকেরা। দলটির সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন ও পরিবেশনার মান অনুযায়ী চলছে দরদাম। ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকারও বেশি সম্মানীতে বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে চুক্তি করছেন আয়োজকেরা।

প্রতি বছরের মতো এবারও কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই হাট। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল থেকে হাটে লোকসমাগম বাড়তে শুরু করে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত হাট চলবে।

বাজার কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এবার দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক বাদকদল হাটে এসেছে। তবে হাটের সবচেয়ে জমজমাট অবস্থা দেখা যায় শেষের দিকে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে হাটে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকের গর্জন ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর হয়ে আছে পুরো এলাকা। একেকটি দল নিজেদের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দক্ষতা প্রদর্শন করছে। পূজা আয়োজকেরা বিভিন্ন দলের পরিবেশনা শুনে পছন্দের দল বেছে নিচ্ছেন। এরপর শুরু হচ্ছে দরদাম ও চুক্তির প্রক্রিয়া। যে দলের বাজনা আয়োজকদের ভালো লাগছে, নির্ধারিত সম্মানীর বিনিময়ে সেই দলকে দুর্গাপূজার মণ্ডপে বাজানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হচ্ছে।

পছন্দের দল নিতে চলছে দরদাম

নরসিংদীর শিবপুর থেকে হাটে এসেছেন পূজা আয়োজক শুভাশিস সূত্রধর। তিনি জানান, প্রতিবছর দুর্গাপূজার জন্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের দল নিতে এই ঐতিহ্যবাহী হাটে আসেন। এবারও সকাল থেকে অনেক দলের বাজনা শুনেছেন। এর মধ্যে একটি দলকে তাঁর পছন্দ হয়েছে। দলটির বাজনা ভালো হওয়ায় ৯০ হাজার টাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছেন তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থেকে আসা তাপস বিশ্বাস জানান, এবারই প্রথম তিনি এই হাটে এসেছেন। এখানে এসে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক বাদকদল হাটে এসেছে। তাদের মধ্যে বিক্রমপুরের পাঁচ সদস্যের একটি দল তাঁর পছন্দ হয়েছে। ৮৫ হাজার টাকায় দলটির সঙ্গে চুক্তি করেছেন তিনি।

বিক্রমপুর থেকে আসা ঢাকি হরলাল দাস বলেন, মুঠোফোনে অনেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে কোথাও যাননি তিনি। এই হাটে না এলে তাঁর মন ভরে না। এখানে এলে অনেকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়, যা তাঁকে আলাদা আনন্দ দেয়। এবার তিনি ৩০ হাজার টাকা সম্মানী চেয়েছেন। বর্তমানে দর-কষাকষি চলছে। কিছুটা কমবেশি করে চুক্তি সম্পন্ন করে তিনি বাড়ি ফিরবেন।

লাখ টাকার বেশি চুক্তির অপেক্ষায় বাদকদল

বিক্রমপুর থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়ে হাটে এসেছেন রণজিৎ মণি দাস। তাঁর দলের সঙ্গে ঢাকসহ বিভিন্ন আধুনিক বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। দলটির জন্য তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী চাইছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই তাঁর দলের সঙ্গে দরদাম করেছেন।

রণজিৎ মণি দাস বলেন, লাখ টাকার কম সম্মানীতে তিনি বাজাতে যাবেন না। তাঁর বিশ্বাস, শুক্রবার রাতের মধ্যেই লাখ টাকার বেশি সম্মানীতে চুক্তি হয়ে যাবে। এই হাটে এলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অনেক বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। তাঁর ভাষায়, এটি এক ধরনের মিলনমেলা।

রাজধানীর নবাবপুর থেকে ঢাক নিয়ে হাটে এসেছেন নিবাস চন্দ্র মনিদাস। বাবার হাত ধরে তাঁর এই হাটে আসা শুরু। আবার তাঁর বাবা এসেছিলেন দাদার হাত ধরে। এভাবেই কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কটিয়াদীর ঢাকের হাট।

নিবাস চন্দ্র মনিদাস জানান, আগে তাঁরা দলবদ্ধভাবে হাটে আসতেন। তবে গত দুই বছর ধরে তিনি একাই আসছেন। গত বছর ১৬ হাজার টাকায় একটি চুক্তি পেয়েছিলেন। এবার তাঁর প্রত্যাশা ২০ হাজার টাকা।

নারায়ণগঞ্জ থেকে ছয় সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন পঙ্কজ সাহা। তিনি বলেন, গত ২৫ বছর ধরে এই হাটে আসছেন। তাঁর মতে, এখানে আসা কেউই খালি হাতে ফিরে যান না। কোথাও না কোথাও একটি ব্যবস্থা হয়ে যায়। পূজা শেষে বাড়ি ফিরে পরের দুর্গাপূজার অপেক্ষায় থাকেন তাঁরা—কখন আবার উৎসব আসবে, আর তাঁরা ঢাকের হাটে যেতে পারবেন।

গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে আট সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন বিশ্বজিৎ পণ্ডিত। হাটের পরিবেশ ও ভালো সম্মানীতে চুক্তি করার সুযোগ তাঁর ভালো লাগলেও প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধার অভাব রয়েছে বলে জানান তিনি।

বিশ্বজিৎ পণ্ডিত বলেন, এখানে এলে ভালো দামে চুক্তি করা যায়। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকিদের জন্য গোসলখানা ও শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। রাতে থাকার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হয়। এ বিষয়ে তিনি বাজার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ধর্ম-বর্ণের সীমানা ছাড়িয়ে সম্প্রীতির মিলনমেলা

ঢাকের হাট এখন আর শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এটি পরিণত হয়েছে একটি সর্বজনীন মিলনমেলায়। বাদ্যযন্ত্রের সুর উপভোগ করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন। ঢাক-ঢোলের সম্মিলিত বাদ্য ও শিল্পীদের পরিবেশনায় পুরো হাট উৎসবের প্রাঙ্গণে পরিণত হয়।

কটিয়াদী পৌর এলাকার বাসিন্দা রতন কুমার সাহা বলেন, দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও ঢাকের হাটটি সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলন ঘটে। তাঁর মতে, এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য অনেক পুরোনো।

পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্যের পেছনের ইতিহাস

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ বছর আগে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের সময়ে কটিয়াদীর ঢাকের হাটের সূচনা হয়। রাজা কটিয়াদীর চারিপাড়ায় তাঁর রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। পূজায় ঢাক, ঢোল ও বাঁশি বাজানোর জন্য সেরা শিল্পীদের খুঁজতে বিক্রমপুর পরগনায় বার্তা পাঠানো হয়েছিল।

সেই আহ্বানে বহু বাদ্যযন্ত্রশিল্পী নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাঁদের বাজনা শুনে সেরা দল নির্বাচন করেন। স্থানীয় জনশ্রুতি বলছে, সেই ঘটনা থেকেই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কটিয়াদীর পুরান বাজারে এই হাট বসানোর প্রচলন শুরু হয়।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রীমা সংঘ হাটটির তত্ত্বাবধান করে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহা বলেন, রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমল থেকেই এই ঐতিহ্যের যাত্রা শুরু। হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে সংগঠনটি। কোনো বাদকদল ভাড়ায় যেতে না পারলে তাদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থাও করা হয়।

মুঠোফোনে চুক্তি, কমছে ঢাকিদের আগমন

আয়োজক, স্থানীয় বাসিন্দা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ঐতিহ্যবাহী এই হাটে ঢাকিদের আগমন কমেছে। তাঁদের মতে, মুঠোফোনে যোগাযোগের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় এমন পরিবর্তন এসেছে।

হাটে এসে একবার চুক্তি হওয়ার পর পূজা আয়োজক ও বাদকদল নিজেদের মুঠোফোন নম্বর বিনিময় করেন। পরবর্তী সময়ে কোনো দলের পরিবেশনা ভালো লাগলে আয়োজকেরা সরাসরি ফোন করে সেই দলের সঙ্গে দরদাম ও চুক্তি করতে পারেন। ফলে পরের বছর উভয় পক্ষেরই হাটে আসার প্রয়োজন কমে যায়।

হবিগঞ্জ সদর থেকে হাটে আসা ঢাকি শ্রী বলরাম পণ্ডিত বলেন, তাঁর একই এলাকার দুটি দল এবার হাটে আসার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ আগে গত বছরের আয়োজকেরা ফোন করে দল দুটিকে চুক্তিবদ্ধ করেন। ফলে দল দুটির আর হাটে আসা হয়নি।

তিনি বলেন, অতীতে এই হাটে যতসংখ্যক ঢাকির সমাগম হতো, বর্তমানে তা অনেকটাই কমে এসেছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এখন তো মানুষ মোবাইল ফোনেই অনেক প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলেন। ফলে আগের মতো ঢাকিদের খোঁজে হাটে আসার প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে কমেছে। তারপরেও এখানে যে পরিমাণ লোকের সমাগম ঘটে সেটা অন্য কোথাও দেখা যায় না।’ এমন ঢাকের হাট আর কোথাও নেই বলেও জানান তিনি।

একই কথা জানিয়েছেন কটিয়াদী পুরান বাজার পরিচালনা কমিটির সদস্য রতন কুমার সাহা। তিনি বলেন, গত বছর হাটে আসা অনেক ঢাকির সঙ্গে এবার মুঠোফোনেই চুক্তি হয়ে গেছে। এ কারণে তাঁদের কেউ কেউ এবার হাটে আসেননি।

নাম ঢাকের হাট, কেনাবেচা হয় না বাদ্যযন্ত্র

নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে ঢাক-ঢোল কিংবা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। বরং বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা নিজেদের দক্ষতা ও পরিবেশনা তুলে ধরেন। তাঁদের বাজনা শুনে পূজা আয়োজকেরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দলগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেন। দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন ও শিল্পীদের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে সম্মানীর পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিক্রমপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাদকদল হাটে এসেছে। ঢাক-ঢোলের পাশাপাশি বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনিসহ বিভিন্ন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও নিয়ে এসেছেন তাঁরা।

তিনি বলেন, হাটের নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় না। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি করে বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা পূজামণ্ডপে বাজাতে যান। অনেক বাদকদল দুই দিন আগেই হাটে এসে উপস্থিত হয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহ্যবাহী হাট এখন আর শুধু বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের চুক্তি করার জায়গা নয়; এটি দুর্গোৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকিদের পদচারণা, শত শত ঢাক-ঢোলের সম্মিলিত বাদ্য এবং শিল্পীদের পরিবেশনায় হাটটি উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকিদের সুবিধার্থে হাটের উন্নয়নমূলক কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার তাঁরা এসব সুবিধা ভোগ করতে না পারলেও আগামীতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। শত শত বছরের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

/এসএন