• ঢাকা
  • শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৯ এএম


মানুষের নানা কথায় দমেননি ওমর, নীলফামারীতে শসার মাচায় ফলিয়েছেন রঙিন তরমুজ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ৬:২৯ পিএম

একসময় যে জমিতে শসা চাষ করতেন, এবার সেই জমিতেই মাচা পদ্ধতিতে রঙিন তরমুজ ফলিয়েছেন নীলফামারী সদর উপজেলার কৃষক ওমর আলী। নতুন ফসল চাষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ছিল লোকসানের আশঙ্কা ও আশপাশের মানুষের নানা মন্তব্য। তবে কোনো কিছুতেই দমে যাননি তিনি। পরিচিত এক ব্যবসায়ীর পরামর্শে শুরু করেন রঙিন তরমুজের আবাদ। তিন বিঘার বেশি জমিতে এখন তাঁর প্রায় ছয় হাজার গাছ রয়েছে। শুরুতে বিনিয়োগ করেছেন প্রায় তিন লাখ টাকা। ফলন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে এই আবাদ থেকে সাত থেকে নয় লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন তিনি।

ওমর আলীর জমিতে চাষ হচ্ছে কিং সুগার ও সূর্য ডিম জাতের রঙিন তরমুজ। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জমিতে কিং সুগার জাতের প্রায় চার হাজার এবং সূর্য ডিম জাতের প্রায় দুই হাজার গাছ রয়েছে। ঢাকা থেকে একটি কোম্পানির মাধ্যমে বীজ সংগ্রহ করে জমিতে রোপণ করেন তিনি। ইতোমধ্যে চাষের প্রায় ৫০ দিন পার হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ৭০ দিনের মধ্যে তরমুজগুলো বিক্রির উপযোগী হবে বলে আশা করছেন এই কৃষক।

প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে মাচা তৈরি করে তাতে রঙিন তরমুজ চাষ করছেন ওমর আলী। মাচার ওপর গাছের বিস্তার ঘটানোর পাশাপাশি ফলের পরিচর্যা, রোগবালাই পর্যবেক্ষণ এবং ফল সুরক্ষায় বিশেষ নজর দিতে হচ্ছে তাঁকে। নতুন ফসলের সঙ্গে মাচা পদ্ধতিতে চাষ করায় প্রয়োজন হচ্ছে বাড়তি অভিজ্ঞতা ও যত্নের। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও প্রথমবারের এই আবাদ থেকে ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন তিনি।

আগে একই জমিতে শসা চাষ করতেন ওমর আলী। উৎপাদিত শসা বিক্রি করতেন এক ব্যবসায়ীর কাছে। সেই ব্যবসায়ীর পরামর্শেই রঙিন তরমুজ চাষের পরিকল্পনা করেন তিনি। তরমুজ বিক্রি করতে না পারলেও প্রতি মণ ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে কিনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন ওই ব্যবসায়ী। সেই ভরসা এবং নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই রঙিন তরমুজ চাষে নামেন ওমর আলী।

তবে শুরুতে পথটা সহজ ছিল না। নতুন ফসল হওয়ায় এ ধরনের তরমুজ চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত। উৎপাদন ব্যর্থ হলে বিনিয়োগ হারানোর আশঙ্কাও ছিল। পাশাপাশি এলাকার মানুষের নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাঁকে। সব শঙ্কা উপেক্ষা করে নিজের উদ্যোগ ও পরিশ্রমের ওপর আস্থা রেখে চাষাবাদ চালিয়ে যান তিনি।

রঙিন তরমুজ চাষে সম্ভাবনা থাকলেও রোগবালাই ও পরিচর্যা নিয়ে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। পোকামাকড়ের আক্রমণ, ফল পচে যাওয়া কিংবা সেচ ব্যবস্থাপনায় সামান্য ভুলের কারণেও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এ কারণে ফল সুরক্ষিত রাখতে জমিতে প্রায় ছয় হাজার নেটের ব্যাগ ব্যবহার করেছেন ওমর আলী। প্রতিটি ব্যাগে রাখা হয়েছে একটি করে তরমুজ।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাষের একপর্যায়ে ওমর আলীর তরমুজগাছ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। পরে কৃষি কর্মকর্তারা তাঁর জমি পরিদর্শন করে চাষাবাদের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। প্রথমবারের আবাদে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হলেও কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সেগুলো মোকাবিলার চেষ্টা করছেন তিনি।

ওমর আলীর হিসাব অনুযায়ী, তিন বিঘার বেশি জমিতে রঙিন তরমুজ চাষে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে তরমুজ বিক্রি করতে পারলে মোট বিক্রির পরিমাণ সাত থেকে নয় লাখ টাকা হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

তবে এই হিসাব সম্ভাব্য বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদিত তরমুজের পরিমাণ, ফলের গুণগত মান, রোগবালাইয়ের ক্ষতি, বাজারদর ও অন্যান্য খরচের ওপর নির্ভর করবে প্রকৃত লাভ। এ ছাড়া ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তরমুজ কিনে নেওয়ার যে আশ্বাস পেয়েছেন, সেটি বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, তা-ও তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমবারের এই চাষে সফল হতে পারলে ভবিষ্যতে আরও পরিকল্পিতভাবে রঙিন তরমুজের আবাদ বাড়াতে চান ওমর আলী। তাঁর আশা, নতুন এই ফসল একদিকে যেমন তাঁর আয়ের সম্ভাবনা বাড়াবে, অন্যদিকে এলাকার কৃষকদেরও বিকল্প ফসল চাষে আগ্রহী করে তুলতে পারে।

মানুষের নানা কথায় দমে যাননি ওমর আলী

এশিয়া পোস্টকে ওমর আলী বলেন, ‘আমার শুরুটা এত সহজ ছিল না। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কথা বলেছেন। লোকসান হবে, ফল হবে না এমন আরও কত কথা শুনতে হয়েছে। তবে আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেটিতে অটল ছিলাম। কারণ, এর আগে যখন শসা চাষ শুরু করি, তখনো মানুষ একই রকম কথা বলেছিলেন। তাই ভয়টা কম ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘বীজ সংগ্রহ করে রোপণের পর যখন ফল আসতে শুরু করে, তখন আবার ওই ব্যক্তিরাই বলেন, তাঁরাও চাষ করবেন। তবে ফসল আসার পর আমার বাগান একটি রোগে আক্রান্ত হয়। তখন কিছুটা হিমশিম খেতে হয়। এরপর তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। আশা করছি, ফল বিক্রির পর মোটামুটি একটা লাভের মুখ দেখতে পারব।’

প্রথমবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ওমর আলী বলেন, ‘প্রথমবার চাষ করতে গিয়ে অনেক ভুল হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা এসে বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দিয়েছেন। আগে যেসব বিষয় জানা ছিল না, সেগুলো শিখতে পেরেছি। তারা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। আগামীতে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী চাষ করতে পারলে আরও বেশি লাভবান হতে পারব বলে আশা করছি।’

নীলফামারীতে রঙিন তরমুজ চাষের নতুনত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নীলফামারীতে এই তরমুজ চাষের উদ্যোগ আমার জানা মতে নতুন। মনের জোরে চাষ শুরু করেছি। আশা করি, এটি লাভজনক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। দিন-রাত জমিতে থাকতে হয়।’

কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ

নীলফামারী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, তাঁরা ওমর আলীর জমি পরিদর্শন করেছেন। বীজ রোপণ করে চাষাবাদ শুরুর সময় তিনি কৃষি বিভাগকে অবহিত করেননি। পরে তাঁরা নিজেরাই খোঁজ নিয়ে সেখানে যান।

আতিক আহমেদ বলেন, ওমর আলী দুই জাতের তরমুজ চাষ করছেন এবং ফলন ভালো হয়েছে। তবে তাঁরা যতটুকু জেনেছেন, একপর্যায়ে তাঁর গাছগুলো বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। কৃষি বিভাগকে বিষয়টি জানানো হলে রোগ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হতো।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেউ এ ধরনের নতুন ফসল চাষে আগ্রহী হলে শুরুতেই নিকটস্থ কৃষি অফিসের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। এতে নতুন কোনো রোগ বা সমস্যার মুখোমুখি হলে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত ওষুধের পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে দ্রুত রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল এশিয়া পোস্টকে বলেন, তাঁরা এই উদ্যোক্তার জমি পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে খুব ভালো ফলন হয়েছে। নীলফামারীতে রঙিন তরমুজ চাষ একটি নতুন উদ্যোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওমর আলী নিজ উদ্যোগে এত বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছেন, এ জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানানো উচিত।

হোমায়রা মণ্ডল আরও বলেন, ওমর আলীকে সহযোগিতা করার জন্য কৃষি অফিস সার্বক্ষণিক চেষ্টা করছে। যেকোনো ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন।

/এসএন