শৈশবেই মা-বাবার স্নেহ হারানোর কষ্ট। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার মৃত্যু। এরপর চাচা-চাচির আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কখনো ইট ভাঙা, কখনো কৃষিকাজ, আবার কখনো টিউশনি করেছেন আমিনুল হক। যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলাধুলা আর আনন্দে মেতে থাকত, সেই বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।
তবে দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতা তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। খাতা-কলম, পরীক্ষার ফি থেকে শুরু করে পড়াশোনার নানা খরচ জোগাতে নিজের শ্রমের পাশাপাশি স্বজন ও গ্রামবাসীর সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। সেই সহায়তাকে শক্তি করে এগিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে অবশেষে সফলতা পেয়েছেন। সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কান্দানিয়া গ্রামের এই তরুণ ৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। পরে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও একই ক্যাডারে সুপারিশ পান। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গেজেটে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১২ অক্টোবর তাঁর চাকরিতে যোগদানের কথা রয়েছে।
আমিনুলের এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন দেখা, পরিশ্রম করা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।
আমিনুল হকের জীবনের কঠিন অধ্যায় শুরু হয় শৈশবেই। তাঁর বয়স যখন মাত্র সাত মাস, তখন মা আমিনা খাতুনের সঙ্গে বাবা ওয়াজউদ্দিন মিয়ার বিচ্ছেদ হয়। এরপর মায়ের স্নেহ ছাড়াই বড় হতে থাকেন তিনি। বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু ২০১২ সালে আমিনুল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর বাবাও মারা যান।
মা-বাবার বিচ্ছেদের পর থেকে চাচা আবদুল খালেক ও চাচি মিনারা খাতুনের কাছে বড় হয়েছেন আমিনুল। তাঁরা নিজেদের সন্তানের মতোই তাঁকে আগলে রেখেছেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশাপাশি দাদি ও ফুফুরাও ছিলেন তাঁর বেড়ে ওঠার সঙ্গী।
আমিনুল হক বলেন, খুব ছোটবেলায় মা চলে গেছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা মারা যান। তাঁর কোনো ভাইবোন ছিল না। চাচা-চাচি, দাদি ও ফুফুরাই তাঁকে আগলে রেখেছেন।
শৈশবের সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে অল্প বয়সেই বাস্তবতা বুঝতে শিখিয়েছে। নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে হলে পড়াশোনার বিকল্প নেই—এমন উপলব্ধি থেকেই লেখাপড়ার প্রতি আরও মনোযোগী হন তিনি। তবে সেই পথ মোটেও সহজ ছিল না।
ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ইট ভাঙার কাজ করেছেন আমিনুল। কখনো মাঠে কৃষিকাজ করেছেন। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর শুরু করেন টিউশনি। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগানোর পাশাপাশি পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতেও কাজ করতে হয়েছে তাঁকে।
বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত, বেড়াতে যেত কিংবা অবসর কাটাত, তখন আমিনুলকে ভাবতে হতো কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন। জীবনের স্বাভাবিক আনন্দগুলো থেকে নিজেকে দূরে রেখে অনেক আগেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে তাঁকে।
আমিনুল বলেন, বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত, বেড়াতে যেত, তখন তাঁকে কাজ করতে হতো। শিশু হিসেবে বিষয়টি তাঁর জন্য কষ্টের ছিল। তখন মনে হয়েছে, সামনে কোনো পথ নেই। পড়াশোনাটাই তাঁর একমাত্র সম্বল।
অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। নিজের শ্রমে যতটা সম্ভব খরচ চালিয়েছেন। পাশাপাশি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এলাকার মানুষ। কেউ টাকা দিয়েছেন, কেউ খাতা-কলম কিনে দিয়েছেন, আবার কেউ পরীক্ষার ফি কিংবা পোশাকের ব্যবস্থা করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ করিম বলেন, স্কুলজীবন থেকেই তাঁরা আমিনুলের পাশে ছিলেন। খাতা, কলম কিংবা পোশাকের প্রয়োজন হলে দিয়েছেন। কলেজে ফরম পূরণের সময়ও টাকা দিয়েছেন। আমিনুল ভালো ছাত্র ছিলেন বলে তাঁদের মনে হতো, তাঁর পাশে দাঁড়ালে একদিন তিনি এলাকার গর্ব হবেন।
আমিনুলের বেড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর চাচা আবদুল খালেক ও চাচি মিনারা খাতুনের। মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত এই শিশুকে তাঁরা নিজেদের সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন। অভাবের সংসারেও তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
চাচা আবদুল খালেক বলেন, সাত মাসের বাচ্চা রেখে আমিনুলের মা চলে গিয়েছিলেন। অনেক কষ্ট করে তাঁকে বড় করেছেন। কোনো দিন ভাতিজা মনে করেননি। তাঁর ভাষায়, আল্লাহই আমিনুলকে বড় করেছেন।
চাচি মিনারা খাতুনের কাছেও আমিনুল ছিলেন নিজের সন্তানের মতোই। তিনি বলেন, নিজের বুকের দুধ খাইয়ে তাঁকে বড় করেছেন। আমিনুলের বাবা মৃত্যুর আগে তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন, তাঁর তিন ছেলে এবং আমিনুল আরেকজন—চারজনকে যেন একই চোখে দেখেন। তিনি কোনো দিন আমিনুলকে আলাদা করেননি।
শৈশবের অনিশ্চয়তা পেরিয়ে আমিনুলের জীবনে যে পারিবারিক আশ্রয় তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তি ছিল এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। নিজেদের সন্তানদের পাশাপাশি তাঁকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বড় করেছেন চাচা-চাচি। তাঁদের ত্যাগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রামবাসীর সহযোগিতা এবং আমিনুলের নিজের কঠোর পরিশ্রম।
কান্দানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে মাধ্যমিক এবং আছিম শাহাবুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন আমিনুল। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থাকতেন স্যার এ এফ রহমান হলে।
গ্রামের সীমিত সুযোগ-সুবিধার পরিবেশ থেকে দেশের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো ছিল তাঁর জীবনের বড় অর্জন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। নিজের খরচ চালাতে টিউশনি করেছেন। সেই সঙ্গে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পাওয়া সহযোগিতাকে তিনি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। পরিবারের ত্যাগ, গ্রামের মানুষের সহায়তা এবং বৃত্তির অর্থ তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ সহজ করেছে। তবে সেই সুযোগ ধরে রাখতে তাঁকে নিজের শ্রম ও অধ্যবসায় অব্যাহত রাখতে হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরির প্রস্তুতিতে মনোযোগী হন আমিনুল। ২০২১ সালের মার্চ থেকে বিসিএসের প্রস্তুতিতে পুরোপুরি মন দেন তিনি। দীর্ঘদিন কোনো কোচিংয়ে পড়েননি। বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রস্তুতি নিয়েছেন।
একদিকে চাকরির প্রস্তুতি, অন্যদিকে জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তাঁকে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। একের পর এক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিজের প্রস্তুতিকে এগিয়ে নিয়েছেন। পাঁচটি বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।
৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও তাঁর নিয়োগ তখনো গেজেট পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পরে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পান। এ বিসিএসের গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর চাকরিতে যোগদানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমিনুলের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। যে তরুণ একসময় পড়াশোনার খরচ জোগাতে ইট ভেঙেছেন, সেই তিনিই এখন শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার অপেক্ষায়।
আমিনুলের জীবনে সাফল্যের আনন্দ থাকলেও রয়েছে গভীর বেদনা। যাঁরা তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের কয়েকজন এই অর্জন দেখে যেতে পারেননি।
তাঁর দাদি মোছা. ওমর জান ২০২১ সালে মারা যান। চাকরির খবর পাওয়ার পর বাবার ও দাদির কবর জিয়ারত করেছেন আমিনুল। জীবনের কঠিন সময়ে দাদি তাঁকে সাহস দিতেন। একদিন বড় কর্মকর্তা হবেন—এমন স্বপ্ন দেখতেন নাতিকে নিয়ে।
আমিনুল হক বলেন, দাদি সব সময় বলতেন, তিনি একদিন বড় কর্মকর্তা হবেন। চাকরি কবে হবে, তা জানতে চাইতেন। আমিনুল তাঁকে বলতেন, পড়াশোনা শেষ হয়নি। দাদি আর দেখে যেতে পারেননি যে তিনি ক্যাডার হয়েছেন। তাঁর বাবাও দেখে যেতে পারেননি। বিষয়টি সারা জীবনের আক্ষেপ হয়ে থাকবে।
যে মানুষগুলো তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন, তাঁদের অনুপস্থিতি সাফল্যের মুহূর্তেও তাঁকে কষ্ট দেয়। তবু তাঁদের ভালোবাসা ও ত্যাগই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণাগুলোর একটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাবিকুন্নাহার সিনথিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় আমিনুলের। পরে ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁরা বিয়ে করেন। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে স্ত্রীর কাছ থেকে মানসিক সমর্থন পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
দীর্ঘদিনের সংগ্রাম শেষে চাকরিতে যোগদানের অপেক্ষায় থাকা আমিনুল এখন নতুন দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর কাছে সাফল্য মানে শুধু একটি চাকরি পাওয়া নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ধরে রাখা।
তরুণদের উদ্দেশে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আমিনুল বলেন, সফলতার জন্য সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য দরকার। এর সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করতে হবে। তাঁর বিশ্বাস, সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য যার মধ্যে আছে, তিনি চাকরি কিংবা ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই সফল হতে পারবেন।
আমিনুল হকের জীবন দেখিয়েছে, শৈশবের প্রতিকূলতা কিংবা আর্থিক সংকট ভবিষ্যতের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয় না। তবে স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়, সুযোগ কাজে লাগানোর মানসিকতা এবং সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানো মানুষের সহযোগিতা।
কান্দানিয়া গ্রামের এই তরুণের সাফল্যে যেমন রয়েছে তাঁর নিজের কঠোর পরিশ্রম, তেমনি রয়েছে চাচা-চাচির নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, গ্রামবাসীর অবদান এবং শিক্ষাজীবনে পাওয়া সহায়তা। ইট ভাঙা থেকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ—এই দীর্ঘ যাত্রা তাই একার লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি একটি গ্রামের বিশ্বাস আর একজন তরুণের অদম্য স্বপ্ন পূরণের গল্প।
/এএসএফ