• ঢাকা
  • রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম


মুসলিম-বান্ধব পর্যটনে তুর্কিয়ে-মালয়েশিয়ার সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৯:৩৭ পিএম

ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনা এবং ট্রানজিট ট্যুরিজম বা সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থায় তুর্কিয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের মধ্যে মুসলিম-বান্ধব পর্যটনে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায় মালয়েশিয়া। দেশটির ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টারের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফয়সাল বিন আবু শুয়াইব খান সম্প্রতি এ কথা জানিয়েছেন।

বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফয়সাল বলেন, ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ এবং সেগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তুর্কিয়ের অভিজ্ঞতা মালয়েশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস হতে পারে।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনায় তুর্কিয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো থেকে আয় করার পাশাপাশি সেগুলোর সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য তহবিল সংগ্রহের যে পদ্ধতি তুর্কিয়ে অনুসরণ করছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন সংরক্ষণের প্রক্রিয়া বেশ ব্যয়বহুল।

ফয়সালের ভাষায়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করে সেগুলোকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করার তুর্কিয়ের পদ্ধতি থেকে মালয়েশিয়া অনেক কিছু শিখতে পারে।

তুরস্ক ও মালয়েশিয়া—দুই দেশই বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা মুসলিম পর্যটন বাজারকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের পর্যটন খাত আরও সম্প্রসারণ করতে চায়।

তুর্কিয়ের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটি পর্যটন খাত থেকে ৬৫ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। একই বছর দেশটির জাদুঘর ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে প্রায় ৬ কোটি ৫৯ লাখ দর্শনার্থী গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটি ৪ কোটি ২২ লাখ আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীকে স্বাগত জানিয়েছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ। ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ প্রচারণার মাধ্যমে দেশটি পর্যটন খাতকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা করছে।

তুর্কিয়ের ‘ট্রানজিট ট্যুরিজম’ মডেল

ইস্তাম্বুলে নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ফয়সাল বলেন, তুর্কিয়ের ট্রানজিট ট্যুরিজমের এই বিশেষ মডেল মালয়েশিয়াও গ্রহণ করতে পারে।

রাশিয়ার কাজান যাওয়ার পথে ইস্তাম্বুলে প্রায় আট ঘণ্টার যাত্রাবিরতি ছিল ফয়সালের। ওই সময় টার্কিশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে তাকে এবং তার এক সহকর্মীকে ইস্তাম্বুল শহর ঘুরে দেখার জন্য একটি বিশেষ ট্যুরের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তিনি জানান, তাদের বিমানবন্দর থেকে শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বসফরাস প্রণালী বরাবর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখানোর জন্য একটি ক্রুজ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। সেখানে গোল্ডেন হর্নসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও তুলে ধরা হয়।

পরবর্তী ফ্লাইট ধরার আগে যাত্রীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল ওই কর্মসূচিতে।

ফয়সাল বলেন, এটি ছিল দারুণ একটি উদ্যোগ। ছোট হলেও সুন্দর এই সৌজন্যমূলক আয়োজন তাদের মনে ভবিষ্যতে আবার ইস্তাম্বুলে ফিরে আসার আগ্রহ তৈরি করেছে।

তার মতে, পুরো ট্যুরটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যা ছিল এক ধরনের ‘টিজার’ বা আগাম ঝলক। এর মাধ্যমে যাত্রীদের ভবিষ্যতে আবার ইস্তাম্বুলে এসে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং শহরটি উপভোগ করার প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়।

ফয়সাল জানান, তিনি চান কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময়ের জন্য ট্রানজিটে থাকা যাত্রীদের জন্য মালয়েশিয়াও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করুক।

ইস্তাম্বুলের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১ ও ২ নম্বর টার্মিনাল ব্যবহারকারী ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে তাদের কুয়ালালামপুর শহর ঘুরিয়ে দেখানো সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে তারা আবারও মালয়েশিয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে উৎসাহিত হতে পারেন।

সহযোগিতা হতে পারে দ্বিপাক্ষিক

ফয়সাল জোর দিয়ে বলেন, এ সহযোগিতা শুধু মালয়েশিয়ার তুর্কিয়ে থেকে শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মুসলিম-বান্ধব পর্যটনের মান নির্ধারণে মালয়েশিয়ার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেটিও তুর্কিয়ের সঙ্গে বিনিময় করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, তারা যেমন তুর্কিয়ে থেকে শিখতে পারে, তেমনি নিজেদের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নিতে পারে। তার মতে, সহযোগিতাটি দুই পক্ষের জন্যই উপকারী হতে পারে।

মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার মূলত মুসলিম-বান্ধব পর্যটন ও আতিথেয়তার জন্য মান নির্ধারণ, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করে।

ফয়সাল বলেন, তাদের মূল মনোযোগ মুসলিম-বান্ধব পর্যটন ও আতিথেয়তার ওপর। এ ক্ষেত্রে তারা মান নির্ধারণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও গবেষণার কাজও করে থাকে।

সংস্থাটির অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো ‘মুসলিম-ফ্রেন্ডলি ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি অ্যাসুরেন্স অ্যান্ড রিকগনিশন’। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মুসলিম পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদানকারী ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ৫০০টিরও বেশি ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠান মুসলিম-বান্ধব হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে ৭৩টি হোটেল, ৩৯টি ট্রাভেল এজেন্সি, ১১টি স্পা সেন্টার এবং ৩৯০ জন পর্যটক গাইড রয়েছেন।

ফয়সালের মতে, মুসলিম-বান্ধব পর্যটনের মানদণ্ড নির্ধারণে মালয়েশিয়ার এই অভিজ্ঞতা তুর্কিয়ের সুপ্রতিষ্ঠিত পর্যটন অবকাঠামোকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার একটি স্বীকৃত মুসলিম-বান্ধব সনদ রয়েছে। এর ফলে তুর্কিয়ে ভ্রমণকারী পর্যটকেরা সহজেই বুঝতে পারবেন যে তারা কোনো বিশ্বস্ত ও মুসলিম-বান্ধব হোটেলে অবস্থান করছেন।

তুর্কিয়েতে আগে থেকেই সমৃদ্ধ ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, হালাল খাবার, মসজিদ এবং মুসলিম পর্যটকদের উপযোগী বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। ফলে ফয়সালের মতে, দেশটির জন্য এ ধরনের কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়া এবং মুসলিম-বান্ধব পর্যটন বাজারে আরও সহজে প্রবেশ করা সম্ভব।

মুসলিম বিশ্বের বাইরেও সুযোগ সম্প্রসারণ

ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মালয়েশিয়া ৯৭ লাখ মুসলিম দর্শনার্থীকে স্বাগত জানিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ১ কোটি ৫২ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি।

মালয়েশিয়ার মুসলিম-বান্ধব পর্যটন স্বীকৃতি কাঠামো আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত হচ্ছে। রাশিয়া, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রাজিলের মতো বাজারে এ-সংক্রান্ত সহযোগিতা বাড়াচ্ছে সেন্টারটি।

ফয়সাল জানান, অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে এ ধরনের মানদণ্ড বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। কারণ এসব দেশে মুসলিম পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবা খুঁজে পাওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে।

তিনি বলেন, অমুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার স্থানীয় হালাল সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত হালাল খাবারের সনদ দেয়। এর সঙ্গে মুসলিম-বান্ধব নিশ্চয়তা স্বীকৃতি যুক্ত করা হলে হালাল রেস্তোরাঁর পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল ও অন্যান্য সেবাকেও মুসলিম পর্যটকদের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

ফয়সালের মতে, এর ফলে অমুসলিম দেশগুলোতে ভ্রমণকারী মুসলিম পর্যটকেরা নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সেবা সম্পর্কে আগে থেকেই নিশ্চিত হতে পারেন এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা বেছে নিতে পারেন।

তিনি বিশ্বাস করেন, তুর্কিয়ে ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা দুই দেশের পর্যটন খাতের জন্যই সুযোগ তৈরি করবে। তার মতে, দুই দেশকে পরস্পরের প্রতিযোগী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

ফয়সাল বলেন, সহযোগিতাটি দুই দিকেই হতে পারে। পর্যটকেরা তুর্কিয়ে ঘুরে মালয়েশিয়ায় আসতে পারেন। আবার মালয়েশিয়া থেকে কোনো তৃতীয় দেশে যাওয়ার পথেও তারা তুর্কিয়েতে কিছু সময় অবস্থান করতে পারেন।

তার ভাষায়, দুই দেশের লক্ষ্য ও বাজার একই হওয়ায় নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় না গিয়ে একসঙ্গে পর্যটন খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

/এএসএফ