• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম


ডিজেলের দাম বাড়ার অজুহাতে বাড়তি ভাড়া নয়, কঠোর নজরদারি চায় জনসাধারণ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯:৩৫ পিএম

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা যেমন বাস্তব, তেমনি রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকসানের বিষয়টিও বাস্তব। কিন্তু সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পরিবহন খাতে ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলেই সব ধরনের বাসের ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাড়তি ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত সাধারণ বাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। গ্যাসচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়নি। অথচ ঢাকার গণপরিবহনের বড় একটি অংশ গ্যাসচালিত। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে গ্যাসচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া নেওয়া হলে তা সরাসরি অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

এ কারণে কোন বাস ডিজেলচালিত আর কোনটি গ্যাসচালিত—যাত্রীদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারকে মাঠপর্যায়ে বিষয়টি কঠোরভাবে তদারক করতে হবে।

ডিজেলচালিত বাসের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের সুযোগ নেই। কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকার বড় বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা এবং মিনিবাসে ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫৯ পয়সা হবে। দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হওয়ার কথা।

অর্থাৎ ২৫০ কিলোমিটারের একটি দূরপাল্লার যাত্রায় বাড়তি ভাড়া হওয়ার কথা প্রায় ৪২ টাকা ৫০ পয়সা। কোনো রুটে আগের ভাড়া ৬০০ টাকা হলে তা আনুমানিক ৬৪৩ টাকার কাছাকাছি হওয়ার কথা, টোলের হিসাব অবশ্য আলাদা। সেখানে কোনো বাস যদি ৬৫০, ৭০০ টাকা বা তারও বেশি ভাড়া দাবি করে, সেই বাড়তি অর্থের যৌক্তিকতা অবশ্যই যাচাই করা প্রয়োজন।

রাজধানীর স্বল্পদূরত্বের যাত্রায় বাড়তি ভাড়া আদায়ের আশঙ্কা আরও বেশি। কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধির অর্থ চার কিলোমিটারের যাত্রায় বাড়তি মাত্র ৬৮ পয়সা। কোনো তিন-চার কিলোমিটারের যাত্রায় ভাড়া যদি ১০ টাকা হয়ে থাকে, শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে সেটি ১৫ টাকা করে দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

অথচ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ পরিবহন খাতে নতুন নয়। তাই এবার সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

প্রতিটি রুটের পুরোনো ও নতুন ভাড়া, যাত্রাপথের দূরত্ব এবং প্রযোজ্য টোলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন। প্রতিটি বাসে নতুন ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি বাসটি ডিজেলচালিত নাকি গ্যাসচালিত, সেটিও যাত্রীদের কাছে স্পষ্ট থাকতে হবে।

গ্যাসচালিত বাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ কোনোভাবেই রাখা উচিত নয়। আর ডিজেলচালিত বাসের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নতুন ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই ধরনের অনিয়ম বারবার হলে রুট পারমিট স্থগিত এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অনুমোদন বাতিলের মতো বিধান কার্যকর করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

যাত্রীদের সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ পরিবহন খাতে সমস্যা শুধু ভাড়া বৃদ্ধিতে নয়; ভাড়া নির্ধারণের পর সেটি বাস্তবে কার্যকর না হওয়াও দীর্ঘদিনের সমস্যা।

জ্বালানির দাম বাড়লে বাসভাড়া বাড়ে, কিন্তু জ্বালানির দাম কমলে অনেক সময় সেই অনুযায়ী ভাড়া কমে না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ অবস্থায় জ্বালানির মূল্য ও পরিবহন ভাড়ার মধ্যে একটি স্বচ্ছ ও বাধ্যতামূলক সমন্বয় পদ্ধতি প্রয়োজন।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু বাসযাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পণ্য পরিবহন, কৃষিতে সেচ, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক বাজারদরের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে যদি পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় যুক্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর একই সংকটের বাড়তি বোঝা চাপবে।

রাষ্ট্র অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কারণে জনগণের ওপর বাড়তি মূল্য আরোপ করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরিবহন মালিকদের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। ডিজেলচালিত বাসে সরকার নির্ধারিত যৌক্তিক ভাড়াই নিতে হবে। আর গ্যাসচালিত বাসের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এখন সরকারের দায়িত্ব শুধু নতুন ভাড়া ঘোষণা করা নয়; কোন বাসে কত ভাড়া নেওয়া যাবে, কোন ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়া প্রযোজ্য এবং নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কেন অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া যাবে না—এসব বিষয় মাঠপর্যায়ে নিশ্চিত করা।

নিয়মিত নজরদারি, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিই পারে পরিবহন খাতে ভাড়ার নৈরাজ্য ঠেকাতে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি যদি অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনিবার্য হয়, তবে সেই মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে জনভোগান্তি বাড়ানো অনিবার্য নয়। সরকারের হাতে আইন রয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে এবং ভাড়া নির্ধারণের ক্ষমতাও রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই ক্ষমতার কঠোর, নিরপেক্ষ ও নিয়মিত প্রয়োগ।

জনগণ নতুন ভাড়ার বোঝা বহন করবে; কিন্তু ভাড়ার নামে অনিয়মের বাড়তি বোঝা কেন বহন করবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

/এএসএফ