ইরানের রাজধানী তেহরানে সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে অংশ নিয়েছেন লাখো মানুষ। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের হিসাবে, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আয়োজিত এ কর্মসূচিতে তিন লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় জড়ো হন। এ সময় ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে লড়াই করার প্রস্তুতির কথা জানান অনেকে।কয়েকজন সমাবেশকারী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা পদদলিত করেন। এ সময় ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ ও ‘ইসরায়েলের মৃত্যু হোক’ স্লোগানও দেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর এটিই দেশটিতে এ ধরনের সবচেয়ে বড় সমাবেশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।যুদ্ধের মধ্যে দেশের জনগণকে একত্রিত করা এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা জোরালো করতে ইরান সরকার এ ধরনের কর্মসূচির আয়োজন করছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন করে আরোপ করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো।সরকারি উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘জানফাদায়ে ইরান’, অর্থাৎ ‘ইরানের জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত’ নামে একটি কর্মসূচিতে সীমিত সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নিতে স্বেচ্ছাসেবীদের আহ্বান জানানো হচ্ছে। কত মানুষ এতে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া গেছে।শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) তেহরানের কেন্দ্রীয় এলাকায় সামরিক পোশাক পরে পতাকা হাতে মিছিল করেন স্বেচ্ছাসেবীরা। পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ তাদের উৎসাহ দেন।গত কয়েক দিন ধরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে জনগণকে উৎসাহিত করে আসছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিগগিরই স্বেচ্ছাসেবীদের অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই স্বেচ্ছাসেবীরা দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থায় অতিরিক্ত একটি স্তর হিসেবে কাজ করবেন।এরই মধ্যে ইরানের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং এর স্বেচ্ছাসেবী শাখা বাসিজ দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।তেহরানের আইআরজিসির প্রধান জেনারেল হাসান হাসানজাদেহ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে ছয় লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও জানান তিনি।শুক্রবার সকালে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, তেহরানের রাস্তায় তিন লাখের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশের শুরুতে বাসিজের নতুন প্রধান হোসেইন তাইয়েব বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা ‘পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষার’ জন্য প্রস্তুত থাকবেন। শিগগিরই ইরানের অন্যান্য শহরেও একই ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি।ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যখন মিছিলটি দেখছিলেন, তখন তাইয়েব বলেন, নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ইরানের শত্রুদের জন্য একটি ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে উঠবে।সমাবেশে অংশ নেওয়া কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা পদদলিত করেন। এ সময় অনেকে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘ইসরায়েলের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দেন।সমাবেশে অংশ নেওয়া ২৪ বছর বয়সী মারজিয়েহ আফাগি তার স্বামী ও ছোট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানাতেই তিনি সেখানে এসেছেন যে, দেশের বিরুদ্ধে তার হুমকিতে ইরানিরা ভয় পায় না। আফাগির ভাষায়, ‘ইতিহাসে কেউ ইরানে আক্রমণ করে সেখানে টিকে থাকতে পারেনি।’সমাবেশের মধ্য দিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতাও তুলে ধরেছে ইরান। সেখানে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রদর্শন করা হয়। কালো মাথার কাপড় পরা নারী গার্ড সদস্যদের ট্রাকে স্থাপিত মেশিনগানের পাশে অবস্থান করতেও দেখা যায়।আইআরজিসি এমন কিছু ড্রোনও প্রদর্শন করে, যেগুলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে ইরান। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।শুক্রবারের সমাবেশের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল ইরানের নেতৃত্বের কট্টরপন্থি অংশের অবস্থান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাসিজ প্রধান তাইয়েবের মতো নেতাদের বক্তব্য থেকে ভবিষ্যতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রবিরোধী কোনো বিক্ষোভ দেখা দিলে তা দমনে নেতৃত্বের আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।এর আগে জানুয়ারিতে, যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন আগে, ইরানে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ দেশব্যাপী বিক্ষোভ দেখা দেয়। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভ পরে সরকারের বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত অসন্তোষে রূপ নেয়।অ্যাক্টিভিস্টদের দাবি, ওই আন্দোলন দমনে সরকারি অভিযানে সাত হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন এবং কয়েক হাজারের পরিবর্তে ‘দশ হাজারের বেশি’ মানুষ আটক হন। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।এর আগে মে মাসে ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশটিতে ৩ কোটির বেশি মানুষ অনলাইনে ফর্ম পূরণ করে অথবা বিভিন্ন জনসমাবেশে অংশ নিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এই দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
/বিএসএস