• ঢাকা
  • রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম


দিল্লির আন্দোলন কি মোদী সরকারের পতনের দাবিতে রূপ নিচ্ছে?

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১:০৫ পিএম

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বসানো হয়েছে ব্যারিকেড, বন্ধ রাখা হয়েছে মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ। বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য। শনিবার (১০ অক্টোবর) জন্তর মন্তরে বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি ছিল, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

তবে কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই ধরপাকড় শুরু করে পুলিশ। আন্দোলনের নেতা, শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলের রাজনীতিকসহ হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এর মধ্যেই বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী ঘোষণা দিয়েছেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার যাবেন। এই সরকার যাবে। তারপর গণতন্ত্রের মেরামত শুরু হবে।’

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের পতনের দাবিতে রূপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের বিরোধী দলগুলো বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো একটি অভিন্ন দাবিতে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে কি না।

ভোটার তালিকা নিয়ে ক্ষোভ, আন্দোলনের কেন্দ্রে সিজেপি

ভারতে সাম্প্রতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) নিয়ে বিতর্ক। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক যোগ্য ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। বিরোধীদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি, বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র স্থানান্তরিত ভোটার এবং একাধিকবার তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। কমিশনের ভাষ্য, ভোটার তালিকা নির্ভুল করতেই এই সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগের বিপরীতে নিজেদের প্রক্রিয়াকে আইনসম্মত বলেও দাবি করেছে নির্বাচন কমিশন।

এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সংগঠনটি এর আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলন করেছিল। ওই আন্দোলনের চাপে গত জুলাইয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।

এবার সিজেপির আন্দোলনের লক্ষ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে শনিবার দিল্লির জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় চালায়। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং সংগঠনটির অন্য শীর্ষ নেতাদের আটক করা হয়।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লিতে তিন হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। তবে কয়েকটি প্রতিবেদনে আটকের সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সেদিন দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। হাজার হাজার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের ধরপাকড় ও বিধিনিষেধের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার অধিকার খর্ব করা হচ্ছে।

তবে কঠোর নিরাপত্তা ও ধরপাকড়ের মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। সংগঠনটির বক্তব্য, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ এখন রাজপথে সরকার ও বিরোধীদের শক্তি পরীক্ষার রূপ নিচ্ছে।

বিরোধী জোটের শক্ত অবস্থান

এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি কেবল সিজেপির কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার বিভিন্ন নেতা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

বিরোধী নেতারা ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে স্মারকলিপি দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং কথিত ‘ভোট চুরি’ নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের পাশাপাশি নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া বিরোধী জোটের নেতারা সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছেও আবেদন জানানোর কথা বলেছেন। ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের এই অবস্থান আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। শুক্রবার বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গত কয়েক দিনের মতো আন্দোলনের চাপ ধরে রাখতে পারলে সরকার পড়ে যাবে।

পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় রাহুলের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমারের বিদায়ের পর এই সরকারেরও বিদায় হবে, তারপর গণতন্ত্র মেরামতের কাজ শুরু হবে।’

রাহুলের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আন্দোলনের লক্ষ্য শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি প্রকাশ্যেই নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিদায়ের কথাও বলেছেন।

তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন বিরোধীদের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। বিজেপির বক্তব্য, নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ তুলে রাজপথে চাপ সৃষ্টি করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনও তাদের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমকে আইনসম্মত বলে দাবি করেছে।

ফলে বিরোধীদের আন্দোলন যত জোরালো হচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধও তত বাড়ছে।

বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে মিল কোথায়?

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তুলনা টানা হচ্ছে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। শুরুতে আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল একটি নির্দিষ্ট নীতির পরিবর্তন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন, প্রাণহানি এবং সরকারের সঙ্গে সংঘাতের পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এক দফা দাবি ঘোষণা করে। সেই দাবির মূল বিষয় ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার পদত্যাগ।

এরপর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান।

বাংলাদেশের ওই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কোনো আন্দোলন নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শুরু হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার লক্ষ্যও বদলে যেতে পারে। ভারতের বর্তমান আন্দোলন নিয়েও এখন একই ধরনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

তবে ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে এক দফা দাবিতে পৌঁছানোর পেছনে প্রাণহানি, ব্যাপক দমন-পীড়ন এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিস্তৃত জনঅসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ভারতে চলমান আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কেন্দ্রবিন্দু হলো ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। রাহুল গান্ধী মোদী সরকারের পতনের কথা বললেও বিরোধী জোটের সব দল আনুষ্ঠানিকভাবে এক দফা পদত্যাগের দাবিতে একমত হয়েছে—এমন প্রমাণ এখনো নেই।

সুতরাং বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে ভারতের বর্তমান আন্দোলনের তুলনা করা হলেও দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এক নয়।

এক দফার পথে ভারত?

ভারতের চলমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিজেপির নেতৃত্বে তরুণদের এই আন্দোলন কত দিন ধরে রাখা সম্ভব হবে? বিরোধী জোটের দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য সরিয়ে একটি অভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবে কি না? আর ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি কীভাবে হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আন্দোলনের বিস্তার, জনসমর্থন, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর। রাহুল গান্ধীর বক্তব্য আন্দোলনকে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। তবে শুধু বক্তব্যের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব নয়; এ জন্য দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক চাপ ও বৃহত্তর জনসমর্থন প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির মিল আপাতত আন্দোলনের দাবি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। ভারত সত্যিই এক দফা দাবির পথে এগোচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য সামনে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির দিকে নজর রাখতে হবে।

সূত্র: রয়টার্স, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

/এসএন