• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩১ এএম


৯১ বছর বয়সে লন্ডন ছেড়ে গ্রামে, নিজের টাকায় গড়েছেন মসজিদ-হাসপাতাল-পাঠাগার

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ৯:১৪ এএম

লন্ডনে ৪৮ বছরের চাকরি শেষে গ্রামে ফেরা, নিজের টাকায় বদলে দিচ্ছেন জনপদ

বিশাল এক বাড়ি। প্রবেশদ্বার পেরিয়ে সীমানাপ্রাচীর থেকে শুরু করে বসার ঘরের দেয়াল পর্যন্ত সর্বত্র ফ্রেমে বাঁধানো জীবনমুখী বাণী। বাড়ির নকশা, আসবাবপত্র ও রুচিতে স্পষ্ট দীর্ঘ প্রবাসজীবনের ছাপ। অথচ এত বড় বাড়িতে বাস করেন মাত্র তিনজন। ৯১ বছর বয়সী বাড়ির মালিক ডা. মোহাম্মদ ওসমান গনি সরদার এবং তাঁর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা দুজন সহায়ক। তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিরা এখনো লন্ডনে বসবাস করছেন।

এই বয়সে যেখানে অনেকেই সন্তানদের কাছে থাকতে চান, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএসে (NHS) ৪৮ বছরের কর্মজীবনের ইতি টেনে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার মনইল-কানুপুর গ্রামে শুরু করেন জীবনের নতুন অধ্যায়।

লন্ডনে থেকে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু শেকড়ের টান তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে গ্রামের মানুষের কাছে। নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করে এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

নিজের উপার্জনে গ্রাম বদলে দেওয়ার উদ্যোগ

এটি কেবল ব্যক্তিগত দানের গল্প নয়; বরং নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে একটি গ্রামের অবকাঠামো বদলে দেওয়ার উদ্যোগ। ডা. ওসমান গনি সরদারের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তিনি নিজের উপার্জিত অর্থ থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। এ কাজে কারও কাছ থেকে কোনো অনুদান নেননি বলেও জানিয়েছেন তিনি।

লন্ডনে থাকতেই ‘ডা. ওসমান গনি সরদার ফাউন্ডেশন’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। তবে বাইরে থেকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা না পাওয়ায় নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়েই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাঁর অর্থায়নে মনইল-কানুপুর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে মসজিদ, পলিক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টার, কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অবকাঠামো।

মনইল-কানুপুর জামে মসজিদ

তাঁর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি মনইল-কানুপুর জামে মসজিদ। স্থানীয়দের তথ্য ও তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মসজিদটি নির্মাণে ইতিমধ্যে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নির্মাণকাজ এখনো চলমান।

ডা. ওসমান গনি পলিক্লিনিক

এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ডা. ওসমান গনি পলিক্লিনিক। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা নিয়মিত রোগী দেখেন। একসময় নিজেও এখানে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতেন তিনি।

কমিউনিটি সেন্টার, কবরস্থান ও অন্যান্য স্থাপনা

তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে সালিমা ওসমান কমিউনিটি সেন্টার, কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ এবং পুকুরের বাঁধানো ঘাট। এসব স্থাপনা স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে ভূমিকা রাখছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন

শিক্ষাক্ষেত্রেও অবদান রেখেছেন ডা. সরদার। কানুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি নির্মাণ করে দিয়েছেন বিজ্ঞান ভবন, সমৃদ্ধ পাঠাগার ও হলরুম।

এ ছাড়া আক্কেলপুর পৌর শহরে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত আক্কেলপুর আদর্শ ক্লাব ও পাঠাগারের জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে নতুন করে ‘আদর্শ কমিউনিটি সেন্টার’ হিসেবে গড়ে দিয়েছেন।

শিক্ষাবৃত্তি ও অসহায় মানুষের পাশে

মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১৩ সালে শিক্ষাবৃত্তি চালু করেন ডা. ওসমান গনি সরদার। মাঝখানে কয়েক বছর বন্ধ থাকলেও বর্তমানে বৃত্তিটি আবার চালু হয়েছে।

প্রধান শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের ঘর নির্মাণেও তিনি গোপনে সহায়তা করেন।

বয়সের কারণে এখন আর নিয়মিত পলিক্লিনিকে বসতে পারেন না। তবে গ্রামের কেউ তাঁর বাড়িতে এলে ফিরিয়ে দেন না। বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ দেন। অনেক সময় রোগীদের ওষুধ কেনার জন্য নিজের পকেট থেকেও অর্থ সহায়তা করেন।

ঢাকা, লাহোর, প্রাগ ও লন্ডনে পড়াশোনা

ডা. মোহাম্মদ ওসমান গনি সরদারের জন্ম একটি মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর বাবা ছিলেন গ্রামের কৃষক। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকা, লাহোর, প্রাগ ও লন্ডন—এই চার শহরে পড়াশোনা করেছেন তিনি।

১৯৫৭ সাল থেকে চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ডা. সরদার। তাঁর ছোট ভাই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।

দীর্ঘ কর্মজীবনে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলেও গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার কষ্ট তাঁকে সবসময় ভাবিয়েছে। তাই অবসরের পর বিদেশে স্বচ্ছন্দ জীবন কাটানোর পরিবর্তে ফিরে এসেছেন নিজের জন্মভূমিতে।

কেন ফিরে এলেন গ্রামে?

গ্রামে ফিরে আসার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. ওসমান গনি সরদার বলেন, “লন্ডনে চিকিৎসা পেশায় থাকার সময়ও গ্রামের মানুষের কষ্টের মুখগুলো ভুলতে পারতাম না। ছোটবেলায় দেখেছি স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর বাসস্থানের কী অভাব ছিল। শেকড় আমাকে সবসময় টানত। ভেবেছিলাম, জীবনে যা পেয়েছি, তার একটা অংশ অন্তত মানুষের কল্যাণে খরচ করে যাব। জীবনের বাকি সময়টা তাই গ্রামের মানুষের সঙ্গেই কাটাতে চাই।”

তাঁর এই বক্তব্যেই ফুটে ওঠে দেশে ফিরে আসার পেছনের ভাবনা। জীবনের দীর্ঘ সময় বিদেশে কাটালেও নিজের গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে।

প্রবাসজীবন ছেড়ে শেকড়ের কাছে

সাধারণত উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের আশায় মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে, আবার শহর ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু ডা. ওসমান গনি সরদার ৯১ বছর বয়সে লন্ডনের জীবন ছেড়ে ফিরে এসেছেন নিজের গ্রামে।

বড় বাড়িতে তিনি থাকেন মাত্র দুজন সহায়কের সঙ্গে। তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিরা এখনো লন্ডনে। তারপরও গ্রামের মানুষের সেবা, শিক্ষা ও চিকিৎসার উন্নয়নে নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করে চলেছেন তিনি।

তাঁর এই উদ্যোগ কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজের শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের কল্যাণে জীবনের অর্জন কাজে লাগানোর প্রত্যয়। প্রাসাদোপম বাড়িতে একা থেকেও তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার অনেক মানুষের ভরসার একজন।

/এএসএফ